তীব্র খরায় পুড়ছে স্বপ্ন: রাজশাহীর লিচু বাগানে চাষিদের হাহাকার
তীব্র তাপদাহের মধ্যে হঠাৎ বৃষ্টিপাতের কারণে রাজশাহীর লিচু বাগানগুলোতে দেখা দিয়েছে অস্বাভাবিক এক পরিস্থিতি। পাকার আগেই গাছে গাছে লিচু ফেটে যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে ঝরেও পড়ছে। এতে চাষিদের মধ্যে বেড়েছে দুশ্চিন্তা, আর উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
জানা গেছে, এপ্রিলের শুরু থেকেই রাজশাহীতে মৃদু থেকে মাঝারি তাপদাহ বিরাজ করছে। বুধবার দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌছায়, যা চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ। এর আগে টানা কয়েকদিন ৩৬ থেকে ৩৯ দশমিক ৫ ডিগ্রির মধ্যে তাপমাত্রা ওঠানামা করেছে। তীব্র এই গরমের মধ্যেই হঠাৎ বৃষ্টিপাত হওয়ায় প্রকৃতির বৈপরীত্যের প্রভাব সরাসরি পড়েছে লিচু বাগানে।
নগরীর কুমারপাড়া মোড় এলাকার ব্যবসায়ী রিপন জানান, তিনি পান-সিগারের পাশাপাশি মৌসুমি ফল বিক্রি করেন এবং এ বছর শখ করে একটি ছোট লিচু বাগান লিজ নিয়েছেন। কিন্তু বাগানে গিয়ে তিনি হতাশ। "গাছে ভালোই ফল ধরেছিল, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই পাকবে ভাবছিলাম।
কিন্তু প্রতিটি থোকায় দু-একটি করে লিচু ফেটে গেছে। অনেক ফলের গায়ে কালচে ও খয়েরি দাগ পড়েছে, ছোট লিচু ঝরে মাটিতে পড়ে আছে। এখন তরমুজ বিক্রি করছি, লিচু থেকে কতটা লাভহবে জানি না," বলেন তিনি।
একই চিত্র দেখা গেছে রাজবাড়ী বিদিরপুর এলাকার একাধিক বাগানে। স্থানীয় বাগানি সামসুল মেম্বারের ছেলে সনি জানান, "গরমে লিচু ঝরে পড়া নতুন কিছু না, কিন্তু এবার এর মাত্রা অস্বাভাবিক। এতে উৎপাদন কম হবে বলে আশঙ্কা করছি।"
এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, তীব্র তাপদাহের মধ্যে হঠাৎ বৃষ্টিপাতের ফলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ সময় গরমে থাকার পর হঠাৎ বৃষ্টি হলে লিচুর ভেতরের অংশ দ্রুত স্ফীত হয়, কিন্তু খোসা সেই চাপ সহ্য করতে না পেরে ফেটে যায়। মাঠপর্যায় থেকেও এমন তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।
রাজশাহী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের উচ্চ পর্যবেক্ষক শহীদুল ইসলাম জানান, এপ্রিলজুড়ে রাজশাহীতে তাপমাত্রা ঊর্ধ্বমুখী ছিল। বুধবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন ২৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগে ৩৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি তাপমাত্রাও রেকর্ড করা হয়। একই সময়ে বিভিন্ন
দিনে অল্প পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে, যার মধ্যে সর্বশেষ ৬ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে মৃদু তাপদাহ এবং ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রিকে মাঝারি তাপদাহ হিসেবে ধরা হয়। চলতি এপ্রিলজুড়েই এই দুই ধরনের তাপদাহ চলার পর তা তীব্র তাপদাহে রূপ নিয়েছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত বছর রাজশাহীতে ৫৩০ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ করে উৎপাদন হয়েছিল ৩ হাজার ৭৬৮ মেট্রিক টন। চলতি বছর বাগানের পরিমাণ সামান্য কমে ৫২৮ হেক্টরে দাঁড়ালেও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা বেশি ধরা হয়েছিল। তবে বর্তমান আবহাওয়ার প্রভাবে সেই লক্ষ্য অর্জন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, খরার মধ্যে হঠাৎ বৃষ্টিপাতই লিচু ফেটে যাওয়ার মূল কারণ।
এ থেকে গাছকে রক্ষা করতে খরার সময় নিয়মিত সেচ দিতে হবে এবং প্রয়োজনে গাছে পানি স্প্রে করতে হবে। পাশাপাশি হরমোন, বোরণ বা জিংক প্রয়োগ করলে ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব। বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজশাহীর সুস্বাদু লিচু উৎপাদন নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
চাষিরা এখন তাকিয়ে আছেন অনুকূল আবহাওয়ার দিকেড়কারণ সামান্য পরিবর্তনই নির্ধারণ করে দিতে পারে পুরো মৌসুমের লাভ-ক্ষতির হিসাব।