সোমবার , ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
 সোমবার , ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সীমানা নিয়ে পুলিশের রশি টানাটানি, মাদকের স্বর্গরাজ্য রুখতে জনতার ঢাল

আইকন
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:০৯ পূর্বাহ্ন
সীমানা নিয়ে পুলিশের রশি টানাটানি, মাদকের স্বর্গরাজ্য রুখতে জনতার ঢাল

রাজশাহী মহানগরীর ভদ্রা বস্তি। রেললাইন ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই জনপদটি দীর্ঘকাল ধরে পরিচিত ছিল ‘মাদকের স্বর্গরাজ্য’ হিসেবে। গাঁজা, ইয়াবা আর ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেটের রমরমা কারবারে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী বারবার পুলিশের দ্বারস্থ হলেও মিলেছে কেবল আশ্বাস আর ‘সীমানা’ অজুহাত। অবশেষে আইনি বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তায় পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়া সাধারণ মানুষই হাতে তুলে নিয়েছেন প্রতিরোধের ঝান্ডা। পুলিশের অপেক্ষায় না থেকে গড়ে তুলেছেন এক শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ।



ভদ্রা বস্তিতে প্রায় ২০০টি পরিবারের বাস। স্থানীয়দের অভিযোগ, এর মধ্যে অন্তত ২০টি পরিবার সরাসরি মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত। অথচ রেললাইন সংলগ্ন এই এলাকায় মাদক বিরোধী অভিযান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে রাজশাহী মহানগর পুলিশ (আরএমপি) এবং রেলওয়ে পুলিশের মধ্যে রশি টানাটানি।


রেলওয়ে থানার দাবি— পাথরের ওপরের ১০ ফুট জায়গা তাদের, বাকিটা মহানগর পুলিশের। অন্যদিকে আরএমপি দায় চাপায় রেলওয়ে পুলিশের ওপর। এই ‘ঠ্যালাঠেলির’ সুযোগেই অপরাধীরা নির্বিঘ্নে তাদের কারবার চালিয়ে আসছিল।



আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন উদাসীনতায় ক্ষুব্ধ হয়ে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে একাট্টা হন স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা সিদ্ধান্ত নেন, বস্তিতে কোনো মাদক বিক্রি বা ক্রেতাদের প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।


প্রতিরোধের প্রথম ধাপ হিসেবে ২৩ ফেব্রুয়ারি মাদক বিক্রেতাদের ঘরে ঘরে তল্লাশি চালায় এলাকাবাসী। উদ্ধার করা হয় বিপুল পরিমাণ মাদক ও সেবনের সরঞ্জাম, যা জনসম্মুখে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়। এমনকি ইফতারের পর মাদক সেবনের আসর বসানো একদল তরুণকেও হাতেনাতে ধরে সতর্ক করে জনতা। মজার ব্যাপার হলো, ওই আসরে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর একজন সহকারী উপপরিদর্শককেও (এএসআই) পাওয়া যায়, যাকে পরে সতর্ক করে ছেড়ে দেওয়া হয়।



এলাকাবাসীর এই সাহসী আন্দোলনের খবর ছড়িয়ে পড়লে নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। গত বুধবার বস্তিতে ঝটিকা অভিযান চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়। অভিযানে গাঁজাসহ গ্রেফতার হন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ময়না বেগম, আব্দুল্লাহ ও ফুয়াদ। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।


মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রসিকিউটর হেলাল উদ্দীন এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, "এই বস্তির মাদক নির্মূলে এলাকাবাসী যে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন তা সত্যিই প্রশংসনীয়।"



পুরো বিষয়টি নিয়ে রাজশাহী রেলওয়ে থানার ওসি ফয়সাল বিন আহসান আবারও সীমানার বিষয়টি সামনে এনে বলেন, "রেললাইনের পাথরের ১০ ফুট জায়গা ছাড়া বাকিটা আমাদের না, তাই আমরা যাই না।" তবে আরএমপির চন্দ্রিমা থানার ওসি মনিরুল ইসলাম নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, "আমরা খবর পেলেই অভিযানে যাই। তবে মাদকের বিরুদ্ধে এমন সামাজিক প্রতিরোধ অত্যন্ত ইতিবাচক।"


এই প্রতিরোধ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্থানীয় সচেতন ব্যক্তি মো. রুবেল, মো. জিয়া, যুবদল নেতা বিপ্লব রহমান নাঈম, চাঁন মিয়া নয়ন, হামিদুল ইসলাম, প্রবীণ ব্যক্তিত্ব আবু সাঈদসহ আরও অনেকে। তারা জানিয়েছেন, বস্তি থেকে মাদক পুরোপুরি নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত এই পাহারা ও প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে।