ক্ষমতার দর্প ও সম্পর্কের ভাঙন: মাসউদ উদ্দীন চৌধুরী ও এক পরিবারের আর্তনাদ
ভূমিকা
বাংলা প্রবাদে বলা হয়, "কাকের মাংস কাক খায় না", অর্থাৎ স্বজাতি বা স্বজনের ক্ষতি সাধারণত কেউ করে না। কিন্তু রাজনীতির নির্মম মঞ্চে এই চিরন্তন সত্যটি অনেক সময় মিথ্যে হয়ে যায়। বাংলাদেশের ওয়ান-ইলেভেন (১/১১) পরবর্তী সময়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসউদ উদ্দীন চৌধুরী এবং তার নিকটাত্মীয় তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোর মধ্যকার ঘটনাটি সম্পর্কের এই বৈপরীত্যের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। পারিবারিক বন্ধন (ভায়রা ভাই) থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতার পালাবদলে দুই ভাইয়ের ওপর যে অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছিল, তা ক্ষমতার রাজনীতির এক অন্ধকার অধ্যায়কে উন্মোচিত করে।
খালেদা জিয়া ও ১/১১-এর 'মাইনাস টু' ফর্মুলা
তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোর ওপর নির্যাতনের বিষয়টি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না। এটি ছিল তৎকালীন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের 'বিরাজনীতিকরণ' বা 'মাইনাস টু' ফর্মুলা বাস্তবায়নের একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল।
মাতা ও পুত্রদের বন্দিত্ব: ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর বেগম খালেদা জিয়াকে তার সেনানিবাসের মইনুল রোডের বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। একই সাথে তার দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোকেও কারাবন্দি করা হয়।
মানসিক চাপ প্রয়োগ: খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় করতে এবং তাকে দেশত্যাগে বাধ্য করতে তার দুই সন্তানের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। একজন মা হিসেবে খালেদা জিয়ার কাছে দুই সন্তানের এই চরম কষ্ট ছিল অবর্ণনীয় যন্ত্রণার।
অমানবিক নির্যাতন: তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো
মাসউদ উদ্দীন চৌধুরীদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নির্দেশনায় দুই ভাইয়ের ওপর যে বর্বরতা চালানো হয়েছিল, তার ভয়াবহতা ছিল বর্ণনাতীত :
তারেক রহমানের মেরুদণ্ডে আঘাত: রিমান্ড চলাকালীন তারেক রহমানকে ছাদ থেকে নিচে ফেলে দেওয়া বা বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠে। এর ফলে তার মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যায়, যা পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক চিকিৎসকদের দ্বারা প্রমাণিত হয়। এই পঙ্গুত্ব তাকে আজও বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।
আরাফাত রহমান কোকোর বিপর্যয়: রাজনীতির সাথে সরাসরি যুক্ত না থাকলেও কোকোকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে নির্মম নির্যাতন করা হয়। এই নির্যাতনের ফলে তিনি ফুসফুস ও হৃদরোগসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হন। পরবর্তীতে নির্বাসিত জীবনে তার অকাল মৃত্যুর পেছনে এই বন্দিত্বকালীন নির্যাতন ও মানসিক ধকলকেই প্রধান কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়।
মাসউদ উদ্দীন চৌধুরীর ভূমিকা ও বিচার প্রসঙ্গ
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অন্যতম শক্তিধর ব্যক্তি ও 'পাওয়ার হাউস' হিসেবে মাসউদ উদ্দীন চৌধুরীর ভূমিকা ছিল চরম প্রশ্নবিদ্ধ।
আত্মীয়তার বিচ্যুতি: ভায়রা ভাই হওয়ার সুবাদে তিনি অন্তত ছোট ভাইদের (তারেক ও কোকো) প্রতি মানবিক আচরণ করবেন—এমনটি প্রত্যাশিত থাকলেও বাস্তবে তিনি ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন।
পরবর্তী রাজনৈতিক সুবিধা: ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাকে পুরস্কৃত করার মতো অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হন।
বিচারের দাবি: ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ১/১১-এর সময়কার মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং হেফাজতে নির্যাতনের দায়ে মাসউদ উদ্দীন চৌধুরীর বিচার ও গ্রেফতারের দাবি নতুন করে জোরালো হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে তদন্তের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
উপসংহার
ইতিহাস সাক্ষী দেয় যে, ক্ষমতার লড়াইয়ে অনেক সময় রক্তের সম্পর্ক গৌণ হয়ে দাঁড়ায়। মাসউদ উদ্দীন চৌধুরী ও তারেক-কোকো ভ্রাতৃদ্বয়ের ঘটনাটি কেবল ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব নয়, বরং এটি একটি পরিবারের ওপর রাষ্ট্রীয় ও আত্মীয়তার ছদ্মবেশে চালানো নির্মম নিপীড়নের উদাহরণ। খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করতে তার দুই সন্তানের জীবন যে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত থাকবে। "কাকের মাংস কাক খায় না"—এই প্রবাদটি এখানে কেবল একরাশ বিষণ্নতাই তৈরি করে। ১/১১-এর সেই সময়কার নির্যাতনের স্বচ্ছ বিচার হওয়া আজ সময়ের দাবি, যাতে ভবিষ্যতে ক্ষমতার লোভে কেউ নিজের স্বজন বা দেশবাসীর ওপর এমন অমানবিক আচরণ করার সাহস না পায়!...
লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক