আগামীর বাংলাদেশ: সংস্কার বনাম চিরাচরিত ধারা"
আজ অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অন্তত দুটি কারণে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। প্রথমত, বিগত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের সাধারণ ভোটারদের একটি বড় অংশ কার্যত ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলেন।
আজ অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অন্তত দুটি কারণে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। প্রথমত, বিগত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের সাধারণ ভোটারদের একটি বড় অংশ কার্যত ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। বিশেষ করে এমন একটি প্রজন্ম রয়েছে, যারা ভোটার হওয়ার পর টানা তিনবার ভোট দিতে পারেননি। সেই প্রেক্ষাপটে এবার তরুণ ভোটারসহ সব নাগরিকের জন্য ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, এবারের ব্যালটে রয়েছে দুটি ভোট। একটি ভোটের মাধ্যমে জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন, অন্যটির মাধ্যমে নির্ধারণ করবেন নির্বাচিত প্রতিনিধিরা কীভাবে দেশ পরিচালনা করবেন। এ দ্বৈত সিদ্ধান্তগ্রহণের সুযোগ এবারের নির্বাচনকে আলাদা গুরুত্ব দিয়েছে।
নির্বাচন ঘিরে শুরুর দিকে নানা ধরনের আশঙ্কা ছিল, বিশেষ করে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে। প্রচারণার সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ও দুর্ঘটনার ঘটনাও ঘটেছে। তবে সার্বিকভাবে বিচার করলে এবারের নির্বাচনী পরিবেশ তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক ছিল। মোটামুটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই প্রচারণার পর্ব শেষ হয়েছে এবং অনেক জায়গায় উৎসবমুখর পরিস্থিতিও দেখা গেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর মধ্যে প্রতিযোগিতা ছিল দৃশ্যমান। যদিও প্রচারণার সময় একে অন্যের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বক্তব্য এসেছে, তবে সেটি নির্বাচনী প্রচারণার কৌশলেরই অংশ। এর বাইরে বড় কোনো বিরূপ বা সহিংস পরিস্থিতি দেখা যায়নি এবং অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক দলগুলো সরাসরি প্রতিপক্ষের নাম উল্লেখ না করেই সমালোচনা করেছে।
তবে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন, অর্থ ব্যয় কিংবা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা নিয়ে নানা সময়ে অভিযোগ শোনা গেছে। এছাড়া প্রায় সব রাজনৈতিক দলই ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ না থাকার কথা বলেছে এবং এর জন্য অন্তর্বর্তী সরকার কিংবা নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছে। বাস্তবে এসব অভিযোগও নির্বাচনী প্রচারণার একটি পরিচিত অংশ হিসেবেই বিবেচিত হয়ে থাকে। কারণ যে দল বা প্রার্থী নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত মনে করেন, তারা সাধারণত পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলেন। এ ধরনের বক্তব্য নতুন বা অপ্রত্যাশিত নয়।
এ বাস্তবতার মধ্যেও বলা যায়, নির্বাচন প্রক্রিয়া মোটামুটি একটি সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য ধারার দিকেই এগিয়েছে। ভোটাররা নির্ভয়ে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী ভোট দিতে পারবেন—এমন প্রত্যাশা ও আস্থা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে মূল প্রশ্ন হলো, ভোটের ফলাফল কী হবে এবং পরবর্তী কয়েক দিনে রাজনৈতিক দলগুলো তা কীভাবে গ্রহণ করবে। বিশেষ করে ভোটের ফলাফল ঘোষণার পর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি—বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট তা কীভাবে গ্রহণ করবে, সেটিই হবে বড় পরীক্ষা।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেসব ক্ষেত্রে পরাজিত পক্ষগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল মেনে না নিলেও বাস্তবে তা গ্রহণ করেছিল। তারা সংসদে অংশ নিয়েছিল। যদিও পরবর্তী সময়ে সংসদ বর্জনের মতো রাজনৈতিক কৌশলও অনুসরণ করেছে, যা ধীরে ধীরে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি অংশে পরিণত হয়েছে।
এবারের নির্বাচনেও যদি বড় রাজনৈতিক শক্তিগুলো অনানুষ্ঠানিকভাবে হলেও ফলাফল মেনে নেয় এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংসদ কার্যক্রম শুরু করতে পারে, তাহলে একটি কার্যকর রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। তবে এবারের সংসদের ম্যান্ডেট আগের তুলনায় ভিন্ন হতে পারে। যদি গণভোটের রায় ‘না’ আসে, তাহলে আগের সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই সংসদ ও সরকার পরিচালিত হবে। কিন্তু যদি গণভোটের রায় ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি গণপরিষদ বা কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলি গঠনের বিষয়টি সামনে আসবে। আর এ গণপরিষদের দায়িত্ব হবে জুলাই সনদে উল্লিখিত সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নের রূপরেখা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রণয়ন করা। এ প্রেক্ষাপটে কীভাবে এসব সংস্কার বাস্তবায়িত হবে এবং রাজনৈতিক ঐকমত্য কতটা গড়ে ওঠে, সেটিই হবে নির্বাচনের পরবর্তী পর্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এবারের নির্বাচন শুধু প্রতিনিধি নির্বাচনেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি দেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণের দিকেও ইঙ্গিত দিচ্ছে। সেই অর্থেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি সন্ধিক্ষণের নির্বাচন।
নির্বাচিত ও অনির্বাচিত প্রতিনিধিদের করণীয়
একটি বিশ্বাসযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন হলে তার ফলাফল মেনে নেয়াই গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক নিয়ম। কোনো দল সরকার গঠন করতে না পারলে তার অর্থ এই নয় যে দেশ পরিচালনায় তার কোনো ভূমিকা থাকবে না। বিরোধী দলে থাকলেও জনগণ ভোট দিয়ে যে ম্যান্ডেট দিয়েছে, তার ভিত্তিতে সংসদে গিয়ে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করাই বিরোধী দলের প্রধান দায়িত্ব হবে। সংসদই একজন নির্বাচিত প্রতিনিধির মূল প্লাটফর্ম—সেখানেই নীতি প্রস্তাব, জবাবদিহি এবং সুশাসনের জন্য চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ থাকে। দেশকে সুশাসনের পথে নেয়ার এ দায়িত্ব পালনের অভাবই অতীতে বড় রাজনৈতিক সংকট ও অভ্যুত্থানের দিকে দেশকে ঠেলে দিয়েছিল।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল অত্যন্ত বেশি। কিন্তু সত্য হলো, একটি ভঙ্গুর ও নানাভাবে বিভক্ত রাষ্ট্রের দায়িত্ব পেয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। সেসময় পুলিশ, প্রশাসনসহ রাষ্ট্র পরিচালনার প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই দুর্বল অবস্থায় ছিল। এ প্রাতিষ্ঠানিক ভাঙন ও নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণেই রাস্তায় ৪০০-৫০০ মানুষ জমায়েত হলেই সড়ক দখল বা বিশৃঙ্খলার মতো ঘটনা ঘটেছে, যা নিয়ন্ত্রণ করা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য সহজ ছিল না। কিন্তু এ বাস্তবতার মধ্যেও অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে তিনটি মূল ম্যান্ডেট নির্ধারিত ছিল। প্রথমত, একটি সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করা। এটাই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। দ্বিতীয়ত, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত অপরাধগুলোর বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা। তৃতীয়ত, রাষ্ট্র ব্যবস্থার সেই কাঠামোগত ফাটলগুলো চিহ্নিত করে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া, যার সুযোগে দীর্ঘদিন একটি কর্তৃত্ববাদী শাসন টিকে থাকতে পেরেছিল।
সময়, সক্ষমতা ও সহযোগিতার সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিলে বলা যায়, এ তিন লক্ষ্য অর্জনের পথে অন্তর্বর্তী সরকার কিছুটা অগ্রগতি দেখাতে পেরেছে। ২০২৪-এর আগস্টে দায়িত্ব নেয়া থেকে গতকাল পর্যন্ত, প্রায় দেড় বছরের মধ্যে দেশ একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দিকে দেশকে নিয়ে এসেছে। এছাড়া বিচার প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে বিচারকাজ সম্পন্নও হয়েছে। পাশাপাশি সংস্কারের প্রশ্নে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে দীর্ঘ নয় মাস ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং সেই আলোচনার ভিত্তিতে জুলাই সনদ প্রণীত হয়েছে। যদিও এ সনদে উল্লিখিত সব প্রস্তাবে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো পূর্ণ ঐকমত্য পোষণ করেনি। বহু বিষয়ে ভিন্নমত ও ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে, তবু একটি প্রাতিষ্ঠানিক নথি রেফারেন্ডামের পর্যায়ে পৌঁছেছে—এটিকে অগ্রগতি হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে যদি তুলনার প্রয়োজন হয়, তাহলে সবচেয়ে কাছের উদাহরণ ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তবে সেই সরকারের সঙ্গে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মৌলিক পার্থক্য ছিল। ২০০৭ সালে রাষ্ট্রের প্রায় সব প্রতিষ্ঠান কার্যকর অবস্থায় ছিল; তখন পুলিশ, প্রশাসন, বিচার বিভাগ কিংবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বশূন্যতা দেখা যায়নি। তাদের মূল চ্যালেঞ্জ ছিল বিকৃত ভোটার তালিকা ও নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন, যা করতেই দুই বছর সময় লেগেছিল। রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বা রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কারের দাবি তখন ছিল না। এর বিপরীতে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার শুরু থেকেই চরম প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, নেতৃত্বশূন্যতা এবং অভ্যন্তরীণ অসহযোগিতার মুখে কাজ করেছে। সে তুলনায় দুই বছরের কম সময়ে নির্বাচন আয়োজন, বিচার প্রক্রিয়া শুরু এবং একটি সংস্কার সনদ প্রণয়ন—এ তিনটি অর্জন প্রশংসাযোগ্য। তাদের কার্যক্রমে নানা ধরনের ঘাটতি থাকলেও পুরোপুরি ব্যর্থ বলা যাবে না।
এখন প্রশ্ন হলো, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর তাদের সামনে তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ কী হবে। প্রথম এবং সবচেয়ে জরুরি কাজ হবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা। নির্বাচিত সরকার জনগণের সরাসরি ম্যান্ডেট নিয়ে আসবে, ফলে সুবিধাবাদী চাপ বা অনৈতিক দাবি মোকাবেলা করার সক্ষমতাও তাদের বেশি থাকবে।
দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ হবে আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন। নির্বাচনী ইশতাহারে দেয়া বিপুল প্রতিশ্রুতির সবই বাস্তবায়নযোগ্য নয়—এটা সবাই জানে। ইশতাহার মূলত আকাঙ্ক্ষার দলিল, পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা নয়। কিন্তু জনগণ প্রত্যাশা করবে, বাজেটে যেন অন্তত সেই প্রতিশ্রুতিগুলোর কিছুটা হলেও প্রতিফলন থাকবে। সেই সঙ্গে বাজেটে দিকনির্দেশনাও থাকবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, আইন-শৃঙ্খলা, ব্যবসা পরিবেশ, ব্যাংক ও জ্বালানি খাতে বাজেটের অগ্রাধিকারই হবে সরকারের বাস্তব সক্ষমতা বোঝার প্রথম সূচক।
এর সঙ্গে যুক্ত হবে অসম্পূর্ণ অর্থনৈতিক সংস্কারগুলো—ব্যাংক একীভূতকরণ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংস্কার, বাংলাদেশ ব্যাংকের শাসন কাঠামো, বন্দর ও লজিস্টিকস সংশ্লিষ্ট চুক্তি—যেগুলো শুরু হলেও শেষ করা যায়নি। পাশাপাশি সরকারি কর্মচারীদের বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন নিয়ে তৈরি হওয়া প্রত্যাশা নতুন সরকারের জন্য আরেকটি বড় চাপ তৈরি করবে। সরকারকে এটাও সুচিন্তিত উপায়ে সমাধান করতে হবে।
এগুলোর বাইরে বড় চ্যালেঞ্জ হবে কূটনৈতিক সম্পর্ক নির্ধারণ। এক্ষেত্রে নতুন সরকারকে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। রাজনৈতিক রূপান্তরের পর বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন ও আস্থার সংকট দূর করাও তাদের প্রাথমিক দায়িত্বের মধ্যে পড়বে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, নির্বাচনের পর নতুন সরকারের সামনে তিনটি তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ অনেকটাই স্পষ্ট—আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা, বাস্তবসম্মত ও দিকনির্দেশনামূলক বাজেট প্রণয়ন এবং কূটনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করা। এ তিন জায়গায় নির্বাচিত সরকারের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, দেশকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে তাদের কর্মপরিকল্পনা কতটা বাস্তব রূপ পাবে।
লেখক : আবুল হাসনাত
সম্পাদক ও প্রকাশক , সিটি নউজ রাজশাহী