সোমবার , ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
 সোমবার , ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
"চেহারার পরিবর্তন নয়

চাই চরিত্রের বদল: গদি দখলের ঊর্ধ্বে এক আগামীর ভাবনা"

আইকন
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:২১ পূর্বাহ্ন
চাই চরিত্রের বদল: গদি দখলের ঊর্ধ্বে এক আগামীর ভাবনা"

পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন ছিল এর মৌলিক চালিকাশক্তি। তৎকালীন পাকিস্তানের রফতানি আয়ের বেশির ভাগই হতো পূর্ব পাকিস্তান থেকে, বিশেষ করে পাটের মাধ্যমে। কিন্তু রফতানি আয়ে সিংহভাগ অবদান রাখা সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে শোষিত, আর্থিকভাবে অবহেলিত এবং কাঠামোগতভাবে বৈষম্যের শিকার হয়েছিল। বাজেটে বৈষম্যমূলক বরাদ্দ, অসম শিল্প উন্নয়ন, বাণিজ্য এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর সীমিত নিয়ন্ত্রণ পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছিল। দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও অনুন্নয়নে জর্জরিত পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ তাই অর্থনৈতিক মুক্তির দাবিতে পথে নেমে আসে, যা একসময় চূড়ান্ত স্বাধীনতার দাবিতে রূপান্তর হয়, যার ভিত্তিতে ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান করে নেয়।



স্বাধীনতার ৫৪ বছরে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও সে মৌলিক অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন আজও অপূর্ণ রয়ে গেছে। বৈষম্যমূলক সুযোগ কাঠামো, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক শাসন, দুর্নীতি ও রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি জনগণের বৃহৎ অংশকে স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল থেকে বঞ্চিত করেছে। বিশেষত ২০০৯-২৪ সময়কালে দৃশ্যমান উন্নয়নের আড়ালে ক্রোনি পুঁজিবাদের বিস্তার অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে আরো সংকুচিত করেছে, যার পরিণতিতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান এক ঐতিহাসিক সতর্কবার্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়।



আমি মনে করি ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের এ সময়ে আমরা অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের প্রশ্নে এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। এ নির্বাচনকে কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে; বরং এটি এমন একটি সিদ্ধান্তমূলক মুহূর্ত, যেখানে নির্ধারিত হবে দেশ কি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, বৈষম্য ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের মধ্য দিয়ে চলমান প্রবৃদ্ধির পথেই থাকবে, নাকি ন্যায়ভিত্তিক প্রতিযোগিতা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং নাগরিক ক্ষমতায়নের ওপর প্রতিষ্ঠিত নতুন অর্থনৈতিক পথে যাত্রা শুরু করবে। ২০২৬ সালের এ নির্বাচনই নির্ধারণ করবে অর্থনৈতিক অগ্রগতি কি বাস্তব অর্থে অর্থনৈতিক মুক্তিতে রূপ নেবে, যেখানে মানুষ ভয় ও পক্ষপাতের বাইরে থেকে কাজ, বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনের সুযোগ পাবে, নাকি অর্থনৈতিক অস্বাধীনতা সমাজের আস্থা ও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতাকে আরো দুর্বল করে তুলবে।


আমাদের এমন একটি অর্থনৈতিক মডেল দাঁড় করাতে হবে, যা নৈতিকতা, অন্তর্ভুক্তি, সুশাসন ও মানবিক মূল্যবোধকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে স্থাপন করবে, ফলে একটি ন্যায়ভিত্তিক, স্বচ্ছ ও মানবকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের পথে বাংলাদেশ অগ্রসর হতে পারবে। তবেই একাত্তরের আত্মত্যাগের যথার্থ মর্যাদা রক্ষা হবে এবং অর্থনৈতিক মুক্তির অসমাপ্ত অঙ্গীকার বাস্তবে রূপ নেবে।


ড. ফয়সাল খান: প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, পলিসি হাউজ, ঢাকা