সোমবার , ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
 সোমবার , ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ডায়েরির পাতা ও হৃদয়ের লণ্ডভণ্ড ইতিহাস

আইকন
NEWS Editor
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:০১ পূর্বাহ্ন
ডায়েরির পাতা ও হৃদয়ের লণ্ডভণ্ড ইতিহাস

মানুষের জীবন যেন এক বিশাল মহাফেজখানা, যেখানে প্রতিদিন অসংখ্য গল্পের জন্ম হয়। আমরা আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষণগুলোকে ধরে রাখতে চাই, সযত্নে সাজিয়ে রাখতে চাই ব্যক্তিগত ডায়েরির পাতায়। ভাবি, সাদা কাগজের ওপর নীল কালির আঁচড়ে হয়তো জীবনের সবটুকু নির্যাস বন্দি করা সম্ভব। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় আমরা উপলব্ধি করি—সব গল্প ডায়েরিতে জায়গা পায় না। কিছু গল্প ডায়েরির সেই শান্ত, নিথর পাতার শাসন মানে না; তারা ভেতরে ভেতরে এক নিরব লণ্ডভণ্ড পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।

একটি ডায়েরি সাধারণত আমাদের শৃঙ্খলিত ও নিয়ন্ত্রিত অনুভূতির দলিল। সেখানে আমরা সেইসব স্মৃতিকেই স্থান দিই, যা আমরা মনে রাখতে চাই কিংবা যা আমরা নিজের কাছে স্বীকার করতে পারি। কিন্তু জীবনের গূঢ়তম সত্যগুলো অনেক সময় ডায়েরির সেই সীমাবদ্ধ পরিসরের চেয়েও অনেক বেশি বিশৃঙ্খল হয়। সেই গল্পগুলোর কোনো নির্দিষ্ট শুরু থাকে না, থাকে না কোনো ছন্দময় সমাপ্তি। তারা হঠাৎ করেই মনের গহীনে হানা দেয় এবং সাজানো-গোছানো বর্তমানকে এক নিমিষে তছনছ করে দিয়ে যায়। এই লণ্ডভণ্ড করে দেওয়ার ক্ষমতাটুকুই প্রমাণ করে যে, সেই অনুভূতিগুলো কেবল শব্দ দিয়ে প্রকাশ করার মতো সাধারণ কিছু ছিল না।

আসলে যা ডায়েরিতে লেখা হয়, তা হলো আমাদের ইতিহাসের অবশিষ্টাংশ। কিন্তু যা লেখা হয় না, যা প্রতিদিন আমাদের ভেতরে এক অদৃশ্য যুদ্ধ চালিয়ে যায়, সেটাই হলো আমাদের প্রকৃত অস্তিত্ব। কিছু বেদনা এতটাই তীব্র যে কলমের নিব সেই ভার সইতে পারে না; কিছু অনুশোচনা এতটাই দহনকারী যে সাদা কাগজে তা ফুটে উঠলে মনে হয় নিজের ক্ষতকে প্রদর্শনীতে রাখা। ফলে সেই গল্পগুলো অলিখিতই থেকে যায়। ডায়েরির পাতাগুলো হয়তো সময়ের সাথে সাথে হলুদ হয়ে যায়, অক্ষরের বাঁধন আলগা হয়, কিন্তু মনের ভেতর যে গল্পগুলো অবিরাম ভাঙচুর চালায়, তারা চিরকালই জীবন্ত এবং ক্ষুরধার থাকে।

এই লণ্ডভণ্ড হওয়া আসলে এক প্রকার বেঁচে থাকা। ডায়েরির শান্ত পাতায় যে গল্পগুলো ঘুমিয়ে থাকে, তারা আমাদের সান্ত্বনা দেয় ঠিকই, কিন্তু যে গল্পগুলো আমাদের অস্থির করে তোলে, তারাই আমাদের জীবনের গভীরে নিয়ে যায়। সেই অপ্রকাশিত গল্পগুলোই মানুষের জীবনবোধকে গড়ে তোলে, তাকে নতুন কোনো দর্শনের মুখোমুখি দাঁড় করায়। দিনশেষে আমরা ডায়েরি বন্ধ করি ঠিকই, কিন্তু মনের ভেতরের সেই অবিন্যস্ত উপাখ্যানগুলো আমাদের নিরন্তর তাড়া করে ফেরে। ডায়েরির সীমাবদ্ধতা যেখানে শেষ হয়, জীবনের লণ্ডভণ্ড গল্পের গভীরতা সম্ভবত সেখান থেকেই শুরু হয়।