বিপন্ন জনপদ ও গণতন্ত্রের অগ্নিপরীক্ষা : স্বপ্নের অপমৃত্যু রুখবে কে?
একটি অভ্যুত্থান-পরবর্তী বিধ্বস্ত ধ্বংসস্তূপ থেকে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল। কথা ছিল, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে সেই স্বপ্নের চূড়ান্ত বাস্তবায়ন, যেখানে মানুষ নির্ভয়ে তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে এবং একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ গড়ে উঠবে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, নির্বাচনের আমেজ কাটতে না কাটতেই দেশজুড়ে শুরু হয়েছে এক চরম অরাজকতা ও মানবিক বিপর্যয়। যে বাংলাদেশে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তার আশ্বাস চেয়েছিল, সেখানে আজ ধর্ষণ, লুণ্ঠন এবং দখলের মহোৎসব চলছে। এই পরিস্থিতি কেবল অনাকাঙ্ক্ষিতই নয়, বরং এটি পুরো জাতির জন্য একটি চরম অবমাননাকর অধ্যায়।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা খবরগুলো শিউরে ওঠার মতো। কোথাও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় জমি ও সম্পদ দখলের উন্মাদনা চলছে, কোথাও আবার অন্ধকার রাতে অসহায় মানুষের ওপর নেমে আসছে পাশবিক নির্যাতন। ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ যখন ক্ষমতার দম্ভে ঢাকা পড়ে যায়, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্রের নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়েছে। লুটতরাজ ও চাঁদাবাজি এখন অনেক স্থানেই নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অনেক ঘটনা গণমাধ্যমে আসছে সত্য, কিন্তু লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যাওয়া অন্ধকারের ঘটনাগুলো হয়তো আরও বেশি ভয়াবহ এবং গভীর।
এই নৈরাজ্যের মূলে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কলুষতা। একটি পক্ষ বিদায় নেওয়ার পর আরেকটি পক্ষ যখন সেই একই দাপট ও প্রতিহিংসার পথ বেছে নেয়, তখন আমূল পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ছাত্র-জনতা রক্ত দিয়েছিল, তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা বা রহস্যময় নীরবতা এই বিশৃঙ্খলাকে আরও উসকে দিচ্ছে। অপরাধীরা যখন বুঝতে পারে যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি এখনও বিদ্যমান, তখনই তারা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। মনে রাখতে হবে, কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরই গণতন্ত্র নয়; গণতন্ত্রের প্রাণ হলো জননিরাপত্তা ও আইনের শাসন।
বাংলাদেশের মানুষ কখনোই এমন পরিস্থিতির প্রত্যাশা করেনি। তারা চেয়েছিল একটি শান্তিময় পরিবেশ, যেখানে মা-বোনের ইজ্জত রক্ষা পাবে এবং মানুষের তিল তিল করে গড়া সম্পদ কেউ কেড়ে নেবে না। অথচ বর্তমান বাস্তবতায় সাধারণ মানুষ আজ নিজ দেশেই পরবাসী হয়ে পড়ছে। যারা আজ অন্ধকারে বসে লুটপাট ও নির্যাতনের নীলনকশা সাজাচ্ছে, তাদের মনে রাখা উচিত—গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা কোনো নির্দিষ্ট দলের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য ছিল না, তা ছিল প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা রক্ষার লড়াই।
এখনই সময় এই চরম অস্থিরতা কঠোরভাবে দমন করার। সরকারকে কেবল রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে মগ্ন না থেকে মাঠপর্যায়ে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে। অপরাধী যে দলেরই হোক বা যে পরিচয়েই থাকুক না কেন, তাকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। একই সাথে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে সজাগ থাকতে হবে যাতে কোনো ঘটনাই আঁধারে ঢাকা না পড়ে। আমরা যদি এখনই এই অপশক্তিকে রুখতে না পারি, তবে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে পাওয়া অর্জিত গণতন্ত্র কেবল একটি কাগুজে দলিলে পরিণত হবে। বিপন্ন জনপদকে রক্ষা করা এবং মানুষের হারানো বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।